আজ ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

খাগড়াছড়ির গুইমারায় নানান অনিয়ম ও দূর্নীতি

নুরুল আলম:: খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় প্রতিনিয়তই হচ্ছে দূর্নীতি, অনিয়মসহ বিভিন্ন অপরাধ মূলক কাজ। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ ভাবে পাহাড় কাটা, নিয়মনীতি অমান্য করে বালু উত্তোলন, বাজারের ফুটপাত অবৈধ দখল, পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রয়, ফসলী জমি থেকে মাটি উত্তোলনসহ টাউন হল দখল করে ঠিকাদারদের আবাস্থল ও আড্ডা খানায় পরিণত করার অভিযোগ। এছাড়া বিভিন্ন দপ্তর কর্তৃক অসহায়দের মাঝে বিভিন্ন সমাগ্রি বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ব্যাপক আকারে।

জানা যায়, গুইমারায় ব্যাপক ভাবে চলছে পাহাড় কাটার মহাৎসব। প্রশাসনের নজর ফাঁকি দিয়েই রাতের আধাঁরে চলে এসব অবৈধ ভাবে পাহাড় কর্তন। শুধু রাতের আধাঁর নয় অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে দিনে দুপুরেও চলে অবৈধ পাহাড় কাটা। ছোট-বড় সব ধরনের পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে প্রভাবশালী মহলটি। সাধারণত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দোহাই দিয়েই হয় পাহাড় কাটা। আর এসব পাহাড়ের মাটি বিক্রয় হয় বিভিন্ন ইটভাটায় ও স্থাপনা নির্মাণ কাজে। এভাবে পাহাড় কাটা হলে, আসছে বর্ষার মৌসুমে পাহাড় ধ্বসে ব্যাপক প্রাণহানী ঘটার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল।

গুইমারার টাউন হলের জায়গা ও টাউন হল শ্রমিকদের আবাস ভুমিতে পরিনত হয়েছে। প্রায় দুই বছর যাবৎ টাউন হলের জায়গা এভাবে দখলে আছে। ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি বৈদ্যুতিক ফ্যান নেই ও নিচের ফ্লোর চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে আছে। খোজ নিয়ে যানা যায়, এক প্রভাবশালী মহলের অনুমতিতেই এই সরকারি টাউন হলটি এভাবে ব্যাপরোয়া ভাবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে। এভাবে চললে সরকারি মালামাল ক্ষয় ক্ষতি হবে। এছাড়াও গুইমারা বাজারের দক্ষিণ পাশে ব্রিজের নিচে ময়লা আবর্জনা ফেলার জায়গাটিও এক প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় দোকান ঘর নির্মাণ প্লট বরাদ্দ দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

টাউন হলের বিষয়ে জানার জন্য ঠিকাদার মাটিরাঙ্গা উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্রিজ এর কাজটি আমি এবং মাটিরাঙ্গা উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি হুমায়ুন মোরশেদ খান করছি। ব্রিজ নির্মাণের মালামাল ও শ্রমিকদের থাকার জন্য কোথাও জায়গা না পেয়ে কংজরী চৌধুরীর অনুমতি নিয়ে টাউন হলে রেখেছি। তবে সমস্যা হলে মালামাল সরিয়ে নিবে বলে জানান তিনি।

অপরদিকে গুইমারায় সিন্দুকছড়ি, তৈর্কমা, হাফছড়ি, বাইল্যাছড়ি, হাতিমুড়া, জালিয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিময়নীতি ও ইজারা বিহীন উত্তোলন করা হচ্ছে হাজার হাজার ঘনফুট বালু। এভাবে বালু উত্তোলন করতে করতে এক পর্যায়ে খালের পার বিলীন হয়ে ভাঙ্গন শুরু হবে এবং ক্ষতিগ্রস্থ হবে আশপাশে বসবাসরত সাধারন মানুষ। তাছাড়া বালু উত্তোলনের জন্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে দেখা, খাল ও সরকারি জায়গা দখল করেই নির্মাণ হচ্ছে স্থাপনা। এমন চিত্র দেখা যায় গুইমারা, জালিয়াপাড়া, বড়পিলাক ও হাতিমুড়া,বাইল্যাছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় এলাকায়। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব কাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানায়, গুইমারায় প্রভাবশালীদের তান্ডবে অবৈধকে বৈধ আর বৈধকে অবৈধ করার মহাৎসব চলছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে যেই কথা বলতে আসবে তাকে বিভিন্ন হুমকি-ধামকি ও মামলা-হামলা দিয়ে জর্জরিত করে দিবে। তাই এসবের বিষয় কেউ প্রতিবাদ করতে চায় না। সেই সুযোগে সরকারি জায়গা দখলকারী ও বালু উত্তোলনকারীরা ব্যাপরোয়া হয়ে উঠছে।

গুইমারা বাজারের ফুটপাত দখলের চিত্র এখন একটি লক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। যত্রতত্র ফুটপাত দখল করে যেখানে সেখানে স্থাপনা ও টং দোকান নির্মাণ করে ফুটপাত দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। এসব অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের তান্ডবে স্থানীয়রা বিভিন্ন প্রকার সমস্যায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। ফুটপাত দখল করে কাঁচামালের বিভিন্ন পঁচা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছে। আর সেই পঁচা আবর্জনা থেকে রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে আশপাশের এলাকায় ও পথচারীদের মাঝে। তাছাড়া আসছে বর্ষার মৌসুমে এসব আবর্জনা থেকে বিভিন্ন বায়ু দূষিত রোগ ও ডেঙ্গু মশার প্রর্দূভাব দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা আরো বলেন, গুইমারা ঐতিহাসিক সপ্তাহিত দুইদিন শনিবার (ছোট বাজার), মঙ্গলবার (বড় বাজার) বসে। বিশেষ করে এই দুইদিন দুরপ্রান্ত থেকে আসা পরিবহন গুলো বাজারের ফুটপাত দখল ও ব্যাপরোয়া ভাবে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য যানযটের মধ্যে পরে, যার ফলে পথচারীদের চলাচলে ব্যাপক সমস্যার সম্মূখিন হতে হয়। এমনকি দুর্ঘটনার স্বীকার হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া গুইমারা সদরেই রয়েছে একটি মাদ্রাসা, ২টি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি মহাবিদ্যালয় (কলেজ)। ফুটপাত দখলের জন্য স্কুল কলেজ ছুটি হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে হয়। তাই এসব ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় এলাকাবাসী।

গুইমারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পুকুর খননের নাম করে মাটি বিক্রয়ে মেতে উঠেছে একটি চক্র। প্রকৃত পক্ষে এসব মাটি বিক্রয় হয় বিভিন্ন ইটভাটা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা নির্মাণ কাজে। এসব মাটি প্রতি ট্রাক ১ হাজার ৫শত থেকে ২ হাজার টাকা বিক্রয় করা হয় বলে সূত্রে জানা যায়। প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করেই এসব অবৈধ কাজ করে থাকে স্থানীয় কিছু দুষ্ট চক্র মহল। এই চক্রের তান্ডবে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পরেছে। শুধু পুকুর নয় ফসলী জমি থেকে মাটি উত্তোলনেরও অভিযোগ রয়েছে অহরহ। এত অনিয়মের পরও প্রশাসনের নিরব ভূমিকায় নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এলাকাবাসী।

এছাড়াও অসহায়দের মাঝে বিভিন্ন সামগ্রি বিতরণসহ নানান অনিয়ম রয়েছে বিভিন্ন দপ্তরের বিরুদ্ধে। নিজস্ব লোকদের মাঝে বিতরণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, প্রকৃত অসহায় যারা তারা সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু অর্থবিত্তের মালিকরা ঠিকই সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছে। অর্থের বিনিময় আর আত্মীয় স্বজনদের মাঝে সকল সরকারি যা অসহায়দের জন্য বরাদ্দ হয়েছে সেসব বিরতণ করা হচ্ছে।

সচেতন মহল বলেন, গুইমারায় বিভিন্ন অনিয়ম হচ্ছে যা দৃশ্যমান। প্রতিটি সেক্টরেই হচ্ছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। নিয়মনীতি ও সরকারি অনুমতি বিহীন পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন, সরকারি সহায়তা প্রদান, ফুটপাত দখলসহ নানান অনিয়ন হচ্ছে যা লক্ষণীয়। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে এর আরো ভয়াবহ রুপ ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

এসব অনিয়মের বিষয়ে গুইমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিব চৌধুরী জানায়, কোথায় কোথায় অবৈধ ভাবে পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলন হচ্ছে তার সুনিদিষ্ট তথ্য পেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও অনিয়ম ও দূর্ণীতিকে ছাড় দেওয়া হবেনা বলেও হুশিয়ারী প্রদান করেন তিনি।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সহিদুজ্জামান বলেন, অনিয়ন ও দূর্নীতিকে ছাড় দেওয়া হবে না। যেখানেই অনিয়ম হবে অভিযান পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Share

এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

You cannot copy content of this page