আজ ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পার্বত্যাঞ্চলে সরকারি নিদের্শনা অমান্য করেই ইটভাটার কার্যক্রম অব্যহত

নিজস্ব প্রতিবেদক: পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির জেলার ৩ জেলা প্রসাশকগণকে অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধে এইচআরপিবি এর পক্ষে সিনিয়র এডভোকেট মনজিল মোরসেদ কর্তৃক লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন ইটভাটা মালিকরা রীট পিটিশন দায়ের করলে শুনানী শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ রীট পিটিশন খারিজ করে দেন। পরবর্তীতে ইটভাটা মালিকগণ আপিল বিভাগে ২টি আপিল দায়ের করলে মাহামান্য আদালত আপিল নিস্পত্তি করে রায় দেন এবং চেম্বার কোর্টে স্থিতিবস্থা ভ্যাকেট করেন।

উপরোক্ত আপিলদ্বয়ের স্থিতিবস্থা ভ্যাকেট হওয়া স্বত্ত্বেও ইটভাটা মালিকেরা প্রশাসনের সামনে অবৈধ ভাবে ইটভাটা পরিচালনা করে যাচ্ছেন। কিন্তু অবৈধ ইটভাটা বন্ধে মহামান্য আদালতের নিদের্শনা থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সে কারনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ ধ্বংশ হচ্ছে। অন্যদিকে এইচআরপিবি এর করা জনস্বার্থের মামলায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ রয়েছে। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি এক নির্দেশনায় সকল জেলা প্রশাসকদের অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিদের্শ দিয়েছেন।

সম্প্রতি সে বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধে জেলা প্রসাশকগণদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিজ নিজ জেলায় ইট ভাটার কার্যক্রম বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য এইচআরপিবি এর প্রেসিডেন্ট সিনিয়র এডভোকেট মনজিল মোরসেদ লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করেছেন। ১৯ জুন ২০২৩ ডাকযোগে এ নোটিশ প্রেরন করা হয়।

৮ নভেম্বর ২০২৩ ইটভাটার সকল কার্যক্রম বন্ধে উকিল নোটিশ প্রেরণ করা হলেও নিয়ম অমান্য করে খাগড়াছড়ি জেলা অধিকাংশ ইটভাটায় ইট তৈরির কাজ চলছে বলে জানা গেছে। তবে নামে মাত্র কিছু ইটভাটায় জরিমানা করলেও জরিমানাকৃত ইটভাটা গুলোতে এখনো বহালতবিয়তে ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ অব্যহত রেখেছে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, বান্দরবান জেলা মোট ইটভাটা রয়েছে প্রায় ৪৬টি। এর মধ্যে নামা পাইতং উপজেলায় ২৭টি, আলিকদমে ৩টি, নাইখ্যাংছড়িতে ৪টি, বান্দরবান সদরে ৯টি, রুমায় ২টি ও থানচিতে ১টি। সরকারি ভাবে ইটভাটার সকল কার্যক্রম বন্ধের আইনি নোটিশ থাকা সত্বেও তা অমান্য করে ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ অব্যহত রেখেছেন ভাটার মালিকরা। বনের কাঠ জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করে প্রতিনিয়িত ইটপোড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এসব দেখেও যেন না দেখার ভান করছে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, এইচআরপিবি পার্বত্য অঞ্চলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং রাঙ্গামাটি জেলার অবৈধ ইটভাটা বন্ধের জন্য জনস্বার্থে হাইকোর্ট রীট পিটিশন নং ১২০৪/২০২২ দায়ের করলে শুনানী অন্তে হাইকোট রুল জারী করে অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। ইটভাটার মালিকরা উক্ত আদেশ মোডিফিকেশন চাইলে হাইকোর্ট আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করলে চেম্বার জজ বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম জেলা প্রশাসক বান্দরবানকে যদি কোন অবৈধ ইটভাটার মালিক অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করেন তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।

সে প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় এইচআরপিবি-এর প্রেসিডেন্ট সিনিয়র এডভোকেট মনজিল মোরশেদ আপীল বিভাগে বান্দরবান জেলা প্রশাসকসহ মোট ২০জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পিটিশন আপীল বিভাগে দায়ের করেন। যাদের বিরুদ্ধে অবমাননার পিটিশন দায়ের কারা হয়েছে তারা হলেন- বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন, ইটভাটা মালিক মোহাম্মম ইসলাম, মোঃ নাসিরু আলম, বিপ্লব কান্তি দাস, হারুনুর রশিদ চৌধুরী, আব্দুল কাদের সওদাগর, মোঃ নাজমুল হক, মোঃ শামসুদ্দিন, থোয়াইংনুং চৌধুরী, আল গাজী আব্দুল মান্নান, মোঃ আজিজুল হক, মোঃ মাকসুদুল আলম, জহির আহমেদ, লক্ষীপদ দাস, বখতিয়ার আহমেদ, ফজল করিম এলাইস, হাজী ফজল সওদাগর, মোঃ নাজমুল হক চৌধুরী, হায়দার আলী, মাহবুবুর রহমান, মোঃ শফিকুল আলম।

সচেতন মহলের দাবি, যেকোনো ব্রিকফিল্ডে জ্বালানি কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ থাকলেও পরিবেশ আইন লঙ্গন করে ইটের ভাটায় কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। তাতে দুষিত হচ্ছে এবং পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। কিন্তু জেলা প্রশাসক জ্বালানি কাঠ পোড়ানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দায় সারা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে।

রাঙ্গামাটি জেলার ২৫টি ইটভাটা জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে সরকারি নিয়মনীতি অমান্য করেই চলছে ইটভাটার কার্যক্রম। এসব ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে বনের কাঠ পোড়ানোর কারনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। এছাড়াও ফসলী জমি থেকে মাটি উত্তোলন করে সেই মাটি দিয়ে তৈরি করছে ইট। অবৈধ এসব ইটভাটা বন্ধে আইনী নোটিশ থাকা সত্বেও মানছেনা ভাটার মালিকরা। যার ফলে স্থানীয় জন জীবন হুমকির মূখে পরছে প্রতিনিয়ত। জানা যায়, রাজস্থলিতে ১টি, কাউখালীতে ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ২টি, লংগদুতে ২টিসহ প্রায় ২৫টি ইটভাটা রয়েছে রাঙ্গামাটিতে। এরই মধ্যে সম্প্রতি ২টি ইটভাটায় জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট। এর পরও থামছেনা অবৈধ এসব ইটভাটার কার্যক্রম।

প্রত্যেকটি জেলায় সকল ব্রিকফিল্ড মালিকদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করে তারা প্রশাসনসহ আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে ম্যানেজ করে।

এবিষয়ে বান্দরবান জেলার লামা ফাইতং এলাকার ইটভাটা সমিতির মোঃ কবির আহাম্মদ ও মোঃ বাদশার সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, সারাদেশের ন্যায় আমরাও ইটভাটা গুলো চালু করেছি। এখানো কয়লা এবং কাঠ দুটিই ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মো: নজরুল ইসলামের সাথে আইন লঙ্গন করে ইটভাটায় কাজ পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক উপজেলা অবৈধ ইটভাটা বন্ধের আদেশ দেওয়া হয়েছে আদেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কোথায় লাইসেন্স বিহীন ইটভাটা রয়েছে এবং ইট তৈরি হচ্ছে এমন অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক জানান, ‘ইটভাটা মালিকেরা যদি প্রশাসনের নির্দেশনা না মানেন, তাহলে মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করে ইটভাটা মালিকদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ‘গত বছর বেআইনিভাবে ইটভাটা চালানোয় বিভিন্ন ভাটায় জরিমানা করা হয়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ করলে এবার কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

খাগড়াছড়ি জেলার বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মোঃ ফরিদ মিয়ার সাথে ইটভাটায় অবৈধ ভাবে জ্বালানী কাঠ ব্যবহারের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অবৈধ ইটভাটাগুলোতে শিগ্রই যৌথ অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান এর সাথে ইটভাটার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোথায় কোথায় জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে ইটভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে তার সু-নিদ্রিষ্ট তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, বান্দরবানের ইটভাটাগুলোর উপর মামলা চলমান আছে। এগুলোর মধ্যে বেশকিছু ভাটার বিরুদ্ধে বন্ধের আদেশ আছে। আমরা আইন মেনে তদন্ত স্বাপেক্ষে জেলা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নিবো।

Share

এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

You cannot copy content of this page